![]() |
| রিকশাওয়ালার রোযা | তৃতীয় পর্ব |
জামাল ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
দরজা খুলে দেখে পাশের বাড়ির সবজি বিক্রেতা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, * আলহামদুলিল্লাহ *
সবজি বিক্রেতা হাতের থেকে একটা প্যাকেট জামালের হাতে তুলে দিয়ে বলল,
" আমার শশুর বাড়ির থেকে কিছু ফল পাঠিয়েছে। এই নিন আপনাকে ও কিছু দিলাম। আপনারা ইফতারি করবেন।"
[ad1]
আধার যেমন আছে আলো ও তেমন আছে। আর সমাজে খারাপ মানুষ যেমন আছে, তেমনি ভালো মানুষ ও আছে।
জামালের মত রিকশাচালক দের সমাজের তথাকথিত উঁচু শ্রেণির মানুষেরা হয়ত সম্মান করতে জানেনা। কিন্তু যারা তার মতই গরীব তারা জানে সম্মান সূচক শব্দটার মর্ম কতটুকু। তারা স্বার্থপর হয়না। নিজের যা আছে তাই দিয়ে অন্যের সাথে আনন্দ ভাগ করতে জানে।
চোখের কোণে অশ্রু চলে আসে জামালের। এই তো এখনো মনে আছে গত বছর একটু মসজিদে গিয়েছিল ইফতারি করতে। কেউ একজন বলেছিল, তুই তো সারাজীবনে কোনোদিন ইফতারি দিস না। তাহলে তুই ইফতারি করতে আসিস কেন।
গরীব হলেও জামালের আত্নসম্মান বোধ অনেক বেশি। সেই কথা শুনে আর কখনো জামাল মসজিদে যাইনি। বাসায় ইফতার করেই মসজিদে যাই নামাজ পড়তে।
কিন্তু যে সবজি ওয়ালা সামান্য রোজগার করে সেই সবজিওয়ালার সহানুভূতি জামাল কে আজ কাঁদায়। আল্লাহর কাছে প্রাণ ভরে দুয়া করে সবজিওয়ালার জন্য।
একমুহুর্তের জন্য বাড়ি ভাড়ার কথা মন থেকে মুছে যাই জামালের। আল্লাহর উপর তায়াক্কুল রেখেই নিজের কাজে মন দেয় সে।
[ad2]
সিয়াম আজ বড্ড খুশি। যে কয়টা রোযা গেছে এত ফল তো কখনো দেখেনি তাই। কিছু সময়ের জন্য বাবার শেখানো রাসূল সাঃ এর হাদিস সে ভুলে যায়।
তাই ইফতার এর সময় এলেই পেট ভরে ফল খেতে চাই ছোট্ট অবুঝ শিশু টি। ঠিক তখন ই জামাল সিয়াম কে মনে করিয়ে দেয় রাসূল সাঃ এর হাদিস টি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আদম সন্তানের জন্য কয়েক লোকমা খাদ্য যথেষ্ট, যা দিয়ে সে তার কোমর সোজা রাখতে পারে (ও আল্লাহর ইবাদত করতে পারে)। এরপরেও যদি খেতে হয়, তবে পেটের তিনভাগের এক ভাগ খাদ্য ও একভাগ পানি দিয়ে ভরবে এবং একভাগ খালি রাখবে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য’। [9] তিনি বলেন, এক মুমিনের খানা দুই মুমিনে খায়। দুই মুমিনের খানা চার মুমিনে খায় এবং চার মুমিনের খানা আট মুমিনে খায় (অর্থাৎ সর্বদা সে পরিমাণে কম খায়)।[10] কেননা মুমিন এক পেটে খায় ও কাফের সাত পেটে খায় (অর্থাৎ সে সর্বদা বেশী খায়)।[11]
মাশাল্লাহ! কি সুন্দর শিক্ষা। বাবার মুখ থেকে হাদিস টি শুনে সিয়াম অল্প করেই ফল খেয়ে নিল।
।
।
প্রতিদিনের মত জামাল সকাল হওয়ার সাথে সাথে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে জীবিকার তাড়নায়। আজ বোধ হয় একটু সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছে জামাল। তাই রাস্তা কেমন জনমানবশূন্য। অবশ্য এই শূণ্যতা বেশিক্ষণের জন্য স্থায়ী হয়নি। অল্পক্ষণের মধ্যেই এই শহর আবার ও ব্যস্ততায় ভরে উঠেছে।
নানান রকম মানুষ এই ব্যস্ত শহরে। কেউ বা একটা খালি থালা নিয়ে রাস্তায় বসে আছে দুটো পয়সার আশায়। কেউ বা আবার ফুল নিয়ে বিক্রি করছে রাস্তায় রাস্তায়। কেউ বা দামি পোশাকে নিজেকে সাজিয়ে ছুটছে অফিসের দিকে।
শান্তি নেই জামালের মতো গরীব মানুষ দের।
ছেড়া জামা, ছেড়া জুতা পরেই হয়ত দিন চলে যায় অসহায় মানুষ গুলোর। কিন্তু তাতে আফসোস নেই জামালের। কারণ সে জানে, এই জীবন শেষ নয়। একটু কষ্ট করতে পারলেই সুন্দর সুখময় জীবন অপেক্ষা করে আছে। যে সুখ কখনো শেষ হবেনা। অনন্তকাল সেই সুখ থাকবে।
ভাবনার জগৎ কে বিদায় দিল এক ভদ্রলোকের ডাক পেয়ে। ভদ্রলোক টি রিকশায় উঠে বসল।
[Labelbox label="story" limit="3" type="grid"]
ইদানীং জামালের শরীর টা ভালো যাচ্ছেনা তাই রিকশা চালাতে গিয়ে সে হিমশিম খেয়ে যায়। একটু আস্তে চালিয়েছে রিকশা, আর ওমনি কি তেজ রিকশা ওয়ালার উপরে।
ক্ষিপ্তভাবে বলল,
" এই ব্যাটা ভাল করে রিকশা চালাতে পারিস না আবার রিকশা চালাতে আসিস কেন।"
জামাল কাতর সুরে বলে,
"ভাই আমার শরীর টা ভাল নয়, এজন্য একটু সমস্যা হচ্ছে।"
কে শোনে কার কথা। বিশাল অট্টালিকায় থাকলে কি আর বোঝা যায় অসহায় মানুষের বুকের ব্যাথা।
জামাল কে মাঝপথে রিকশা থামিয়ে দিতে বলে লোক তা চলে যায়। ভাড়া না দিয়েই। প্রতিদিন এমন ঘটনা তার সাথে অহরহ ঘটে।
সব বিচার আল্লাহই করবে এটাই তার ভাবনা। অবশ্য বিচার চাওয়ার আগে সবার জন্য হেদায়াতের দুয়া চাই সে।
সারাটা দিন রিকশা চালিয়ে আজ ৮০০ টাকা ইনকাম করেছে জামাল। পকেটে হাত দিয়ে এত টাকা দেখে সত্যিই সে অবাক হয়ে যায়। এতটাকা ইনকাম করবে সে ভাবিনি। মনে একটু ভয় ও পায়। ভাবে,
' না জানি কারোর কাছ থেকে প্রয়োজনের বেশি ভাড়া নিয়ে ফেলেছি কি' না।'
[ad3]
ছেলে মাংস কিনতে বলেছিল সে কথা ভেবে আবার দোকানের দিকে এগোয় সে।
আনমোনা হয়ে গিয়েছিল একটু আর কেউ যেন তার পকেট থেকে ৬০০ টাকা বের করে নিয়ে দৌড় দিল। আর সে খেয়াল ও করেনি।
মাংস কিনতে যাবে ওমনি টাকা বের করলো, আবার তার নজরে পড়ে যায় একটি দুধওয়ালার দিকে। দুধ ওয়ালাকে দেখে দুধের মধ্যে পানি মেশাতে। আবার দুধ ওয়ালার কাছে গিয়ে দুধের দাম শুনে বুঝলো,
অন্য সময়ের চেয়ে রমযান মাসে দুধের দাম অনেক বেশি। তখন লোক টাকে বলল,
" ভাই দুনিয়া অল্প দিনের জন্য। আসুন না সমস্ত খারাপ কাজ পরিত্যাগ করি। যা আয় হয় তাই নিয়ে খুশি থাকি। আপনি জানেন খাদ্যে ভেজাল দেওয়া বা খাদ্যের দাম বাড়ানো কত গুনাহের কাজ। "
দুধওয়ালা তখন রেগে গিয়ে বলল,
' এই মিয়া কই পাইলা তুমি এই হাদিস?'
মুচকি হাসি দিয়ে তখন জামাল বলল,
খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ক্রেতার সাথে প্রতারণা করা। প্রতারণা ইসলামে নিষিদ্ধ। হযরত আবূ হরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন - একদা রাসূল (স.) বাজারে এক খাদ্য স্তুপের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি খাদ্য স্তুপের ভিতরে হাত প্রবেশ করিয়ে দেখলেন ভিতরেরগুলো ভিজা। তিনি খাদ্য বিক্রেতার নিকট জানতে চাইলেন - এটি কেমন কথা? সে বলল - বৃষ্টিতে ভিজে গেছে, হে আল্লাহর রাসূল! তদুত্তরে রাসূল (স.) বললেন - তাহলে তুমি খাদ্যগুলো উপরে রাখনি কেন, যাতে মানুষ দেখতে পেত। অতঃপর নবি (স.) বললেন - যে ব্যক্তি প্রতারণা করবে সে আমার উম্মাত নয়। (সাহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১০২)
দুধ ওয়ালা কথাটা শোনার পরে বোধ হয় একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এমন কথা শোনার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিলনা। দুধওয়ালা কোন কথা না বলেই সেখান থেকে চলে গেল।
এদিকে জামাল মাংসের দোকানে গিয়ে পকেট থেকে ২০০ টাকা বের করল, অল্প করে মাংস কিনবে বলে। কিন্তু কেই বা জানে মাংসের বদলে তার কপালে অন্য কিছু অপেক্ষা করছে।
টাকা বের করার পরে যখন দোকান দারের কাছে টাকা টা দিল তখন দোকানদার বলল,
' টাকা না'কি জাল টাকা।'
সারাদিন রোদে গরমে পুড়ে যে টাকা আয় করেছে সে টাকা না'কি জাল। এমন কথা শোনার পর কেউ ই শান্ত থাকতে পারেনা। অনেক কষ্টে ধৈর্য ধারণ করল জামাল। পকেটে হাত দিল অবশিষ্ট টাকা বের করার জন্য। কিন্তু নাহ! পেলনা। কখন যে টাকা চুরি হয়ে গেছে তা সে খেয়াল ও করিনি।
এবার দোকানদার জামালের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। স্তব্ধ জামাল কি বলবে ভাষা খুজে পায়না। ঘরে সামান্য আটা ছাড়া কিছু নেই। বউ বাচ্চার মুখেই বা কি তুলে দিবে,ভেবে পাইনা সে। আচমকা দোকানদারের ধমকানিতে হুশ ফিরে আসে জামালের।
দোকানদার বলে,
' এই কে কোথায় আছো। একে খুটির সাথে বাঁধো। এ 'জাল' টাকার ব্যবসা করে।'
জামাল কান্নামাখা কন্ঠে বলে,
' আমি জানিনা কে দিল এই টাকা। আমি তো 'জাল' টাকার ব্যবসা করিনা। বিশ্বাস করুন।'
দুই একটা থাপ্পড় বেচারি জামাল কে মারল দোকানদার। মুহুর্তের মধ্যে দোকানের সামনে লোক জড়ো হয়ে গেছে। দোকান ও বেশি দূরে নয়। তাই জামিলা আর সিয়ামের কানে কারেন্টের মত পৌঁছে গেল এসব খবর।
জামিলা আর সিয়াম ছুটে এসে দেখে জামাল কে খুটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। সিয়াম দোকানদারের পা ধরে বলে,
" কাকু আমার বাবা ভাল মানুষ। বাবাকে ছেড়ে দিন না।"
ছোট্ট ছেলের কাকুতি মিনতি মন ভোলাতে পারেনা নিষ্টুর মানুষ গুলোর। কেউ বোধ হয় একজন পুলিশ কে ও খবর দিয়েছে। এবার হয়ত পুলিশ এসে জামাল কে নিয়ে যাবে..............
চলবে............
ইনশাআল্লাহ.............
[Labelbox label="story" limit="5" type="list"]
Ai দিয়ে SEO ফ্রেন্ডলি আর্টিকেল লিখেন একদম ফ্রী।